পিছন ফিরে দেখা – টাঙ্গুয়ার হাওর

হাজার হ্রদের দেশ ফিনল্যান্ডে বসে লিখছি, তীব্র শীত পড়েছে বরাবরের মত, পেজা পেজা তুলোর মত তুষার পড়ার দিন আপাতত শেষ, এখন হাড় জমানো ঠান্ডার রাজত্ব। হিমাঙ্কের ৩০ ডিগ্রী নিচে, এত ঠান্ডায় তুষারপাতও বন্ধ হয়ে যায়। পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করছি আলগোছে, সাংবাদিক বন্ধু সীমান্ত দীপু আবার তাগাদা দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশে কোন উল্লেখযোগ্য জায়গায় ভ্রমণের উপর লেখা দিতে হবে।

টাঙ্গুয়ার হাওর

দেশ থেকে এসেছি প্রায় ৯ বছর আগে, কলেজ জীবনের পরপরই, এর পর কত দ্রুতগতিতে বছরগুলো পার হয়ে গেল! ঘটল কত চিত্র-বিচিত্র ঘটনা, বোহেমিয়ানদের মত ঘুরে বেড়ালাম ইউরোপের পথে প্রান্তরে, গেলাম সর্ব উত্তরের মানব বসতি স্পিটসবের্গেন দ্বীপপুন্জে, পৃথিবীর সর্ব উত্তরে ছয় মাস দিন- ছয় মাস রাতের রাজ্য উত্তর মেরুতে, গিরিরাজ হিমালয়ে, মধ্য প্রাচ্যের ধু ধু বালিয়াড়ির মাঝে, আল্পসের সর্বোচ্চ শিখর মঁ ব্লাতে, আন্দেজের কোলে, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে, তিব্বতের নির্জনতায়, মেক্সিকোর পিরামিডে, আফ্রিকার বুনো প্রান্তরে।

আহা, কি সব অপূর্ব স্মৃতি, সামান্য মনোযোগের আভাস পেয়ে মনের মুকুরে রাখা প্রতিটি স্মৃতি জ্বলজ্বল করে উঠছে, তারপরও কেউ যদি প্রশ্ন করে ভ্রমণের মাধ্যমে কোন জায়গাটি সবচেয়ে ভাল লেগেছে, কোনখানে বারংবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই বলব সুনামগন্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, যেখানে প্রথম যাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সাথে পরিযায়ী পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য ২০০২ সালে, সেই প্রথম বাড়ীর বাইরে ঈদ, পুরনো রোজনামচার পাতা থেকে সেই কথায় জানাচ্ছি আজ।

যাত্রা শুরু হল ২২শে ফেব্রুয়ারী, অজানার উদ্দেশ্যে, অদেখার উদ্দেশ্যে। পাখি প্রেমিক , আলোকচিত্রগ্রাহক রোনাল্ড হালদার ভাইয়ের অতি চমৎকার সব পরিযায়ী হাসের ছবি সমৃদ্ধ টি-শার্টের পিছনে দেখতাম Have you ever been to Tangua Haor?

হাওর

যেন সেই হাওরে গেলেই এই রঙ ঝলমলে পাখিগুলো দেখতে পাওয়া যাবে। তখন থেকেই সুপ্ত ইচ্ছা ছিল দেশের একবারে সীমান্তঘেষা পাখির এই গুরুত্বপূর্ণ আবাসভূমিটি দেখে আসার। কাজেই বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সেখানে যাবার খবর পেয়ে একরকম জোর করেই ইনাম ভাই-এর কাছ থেকে সাথে যাবার অনুমতি আদায় করলাম।

সুনামগন্জকে বলা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সমতল অন্চল,যে কারণে এখানে মাইলের পর মাইলব্যপী বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে পানি থৈ থৈ করা হাওর। এমনটাও শুনলাম, এখন যে জমিগুলো আমার দেখতে পাচ্ছি তার অধিকাংশই বর্ষাকালে পানির নিচে তলিয়ে থাকবে।

সুনামগন্জ শহরতলী থেকে সুরমা নদী পথে আমাদের যাত্রা শুরু। সুরমা ভ্রমণের জন্য অতি চমৎকার নদী, অপেক্ষাকৃত কম প্রশ্বস্ত, সর্বদাই শান্ত ভাবে বয়ে চলেছে মৃদুমন্দ হাওয়াকে সাথী করে, প্রবল স্রোত যেমন নেই এখানে, তেমন নেই বিক্ষুদ্ধ ঢেউ। অনেক সময় মনে হয় এযেন মানুষের হাতে তৈরী বড় ধরনের খাল, বিশাল এক সাপের মত একেবেকে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেছে। দুধারের প্রাকৃতিক দৃশ্য তুলনাহীন। আসলে, মাথার উপর অবারিত নীল আকাশ, পায়ের নিচে শান্ত বহমান জলধারা, চারপাশের উম্মুক্ত প্রকৃতি যে কোন মানুষকেই কিছুটা কল্পনাবিলাসী করে তুলবে, তবে বাঁধা এখানেও আছে, সেটা হচ্ছে আমাদের ইন্জিন বোটের বিরক্তিকর একঘেয়ে ঘটঘট উৎকট শব্দ, যাকে বলা চলে রীতিমত উৎপাত!

ও বলা হয় নি, এই ট্রলারই আগামী ৫ দিনের জন্য আমাদের বাড়ী,শুধু মাত্র রাত্রিযাপন নয়, রান্না, খাওয়া থেকে শুরু করে বাথরুম পর্যন্ত সবকিছুই সম্পন্ন করতে এইখানেই। পাখি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ৮জন, বরাবরের মত দলনেতা ইনাম ভাই তার ক্যামেরা, টেলিস্কোপ আর দূরবীন নিয়ে ব্যস্ত, মহাকাশ মিলন ভাই আর এম এ মুহিত ন্যস্ত যাত্রার তদারকিতে, পুরনো ঢাকার আমান ভাই আর আই ইউ বি-এর শিক্ষক সাবির ভাই প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন তারিয়ে তারিয়ে , সাইফ আর আমি দলের কনিষ্ঠতম সদস্য, তাই বলে অপাংক্তেয় নয় মোটেই, আর আছেন সব যাত্রার একমাত্র বিদেশী সঙ্গী চেক ডাক্তার মারিশ্যা ক্রাউসোভা। নৌকার মাঝির সংখ্যা তিনজন, সর্দার শওকত মাঝির পরিপাটি গোফ আর জবাফুলের মত রক্তলাল চোখ বারবার এই অন্চলেরই কিংবদন্তী হাসন রাজার কথা মনে করিয়ে দেয়।

অভিযানের প্রথম দিনে যাত্রা বিরতি করতে হয়েছে মাত্র একবার, এবং তা অবশ্যই পাখি দেখার জন্য। একদা সমগ্র বাংলায় যে পাখিটি সর্বদা চোখে পড়ত, আজ তা আশ্চর্য রকমের দুলর্ভ। আমি শকুনের কথা বলছি, মানুষের অহেতুক ভীতি আর খাদ্য, বাসস্থানের উপর আগ্রাসনের কারণে পরিবেশের দারুণ উপকারী এই পাখিটি অস্তিত্ব আজ বিপন্ন, আর চোখের সামনে একসাথে চারটি শকুন, সেতো রাজদর্শনের মতই দুলর্ভ। এই বিরল দৃশ্যটি কাছে থাকে অবলোকন করা আর তাদের ক্যামেরার ফ্রেমে বন্ধী করার জন্যই আমাদের প্রথম যাত্রা বিরতি।

নদী নিরবধি

প্রথমদিন আরও একঝাক অতি দুলর্ভ প্রাণী দেখার হঠাৎ সুযোগ মিলেছিল আমাদের, তবে তা খেচর নয়, জলচর। নদীর এক বাঁকের মুখে শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিনের ৭-৯ সদস্যের এক দলের সাথে সাক্ষাৎ ঘটল।ভয়ঙ্কর প্রাণী মনে করে অহেতুক শিকার করা আর নদী দূষণের কারণে এদের সংখ্যাও ক্রমশ শূন্যের দিকে আগাচ্ছে, অথচ জীববিজ্ঞানীদের মতে প্রায় অন্ধ এই জীবগুলো কোনভাবেই মানুষের ক্ষতি তো করেই না বরং নানা উপকারে আসে, এভাবেই দিন দিন মানুষের অজ্ঞানতা আর কুসংস্কারের ফলে এদের বিলুপ্তি ঘটছে, যেভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রায় চিরতরে হারিয়ে গেছে মেছো কুমির বা ঘড়িয়াল।

সন্ধ্যার অল্প পরেই আলোর স্বল্পতার কারণে সেই রাতের মত যাত্রাবিরতি করতে হল যেকোন লোকালয় থেকে অনেক দূরে কোন এক অজ এলাকায়, অনাকাঙ্খিত অতিথির উপদ্রব এড়াতে নৌকা থামানো হল নদীর বুকে জেগে সদ্য জেগে ওঠা চরে, কাদায় ভর্তি সেই চরে হাটু পর্যন্ত না ডুবিয়ে হাটা প্রায় অসম্ভব কাজ, তবে লোকালয় থেকে যত দূরেই থাকি না কেন মশাদের গুনগুণ গান কিন্তু সেটা মনে করতে দেয়নি!

সকালে ঘুম ভাঙ্গল সহযাত্রীদের উত্তেজিত কথাবার্তায়, সকলের কথার সারমর্মই এক, এই ভোরে গ্রামের শিশু থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই স্নান করতে নেমেছে, সূর্যদেব এখনো তার দর্শন দেন নি, তবে খুব শীঘ্রই যে মেঘ আর কুয়াশার চাদর হটিয়ে তার অস্তিত্বের জানান দিবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই,আর তখন সূর্যোদয়ের অপরূপ রং ভোরের মেঘে ছড়িয়ে গোটা প্রকৃতিকেই এক অপরূপ আভায় রাঙ্গিয়ে তুলবে,আর অপরূপ সেই দৃশ্যকে ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করে স্নানার্থীদের ভাল কিছু ছবি তোলা সম্ভব হতে পারে,এটাই সবার আলোচ্য বিষয়।

যেমন কথা, তেমন কাজ- মোটামুটি সবাই ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরা হাতে নৌকার ছাদে চলে গেলেন, কিন্তু সবার মনেই একই প্রশ্ন কি কারণে আপামর জনসাধারণ এত ভোরে ঠান্ডার মাঝে জলে নেমেছে? কে যেন বলে উঠল। আজ তো ঈদ! এরা তো ঈদের গোসল করছে। আজ ঈদের দিন, পরিবারের বাইরে প্রথম ঈদ করছি, আশ্চর্য কারো মনেই হয় নি, একবারের জন্যও না! অতএব, ঈদ মোবারক!

আবার যাত্রা শুরু টাঙ্গুয়ার উদ্দেশ্যে,হাওর এলাকায় অনেক আগে প্রবেশ করলেও মূল হাওরে তখনো প্রবেশ করিনি আমরা,কয়েক ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন যাত্রার পরে চোখে যেন কিছুটা দৃষ্টি বিভ্রম দেখা দিল।
দৃষ্টি বিভ্রমই বটে, নাহলে দেশের সবচেয়ে সমতল এলাকা, মাইলের পর মাইলে হাওরের জলা, এখানে পাহাড় আসবে কোথা থেকে? চোখ ভালমত রগড়ে আবার তাকালাম, আরে পাহাড়ইতো! তাও চা বাগানের ছোট খাট টিলা নয় একবারে সুউচ্চ পাহাড়, অনেকটা টেকনাফ থেকে আরাকানের পাহাড় দেখতে যেমন লাগে সে রকম পাহাড়শ্রেণী। হতবিহবল অবস্থা কাটালেন মিলন ভাই, অনেকটা ঘোষণা দেবার ভঙ্গীতে বললেন– মেঘালয়! মেঘালয়!!

তাই তো, আমরা এখন সীমান্তবর্তী এলাকায়, দূরে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেনী আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমে আছে, দূর থেকে মনে হচ্ছে পেজাঁ তুলোর ভেলা ভীড় করে আছে, সহযাত্রীদের কেউ বলে উঠল যথার্থ নাম মেঘালয়- মেঘের আলয়।

আলোছায়া

পথে পানাবিলে দেখা হল বিশ্বব্যপী বিপন্ন এবং মাছ ধরায় অপরিসীম দক্ষতার অধিকারী পাখি অসপ্রে (কালিগাল মেছো চিলে)র সাথে, সে উড়ে এসেছে ইউরোপের কোন প্রান্ত থেকে, নাতিষীতোষ্ণ শীতের আশায়।

এরকমই এক বিশাল বিলের মাঝে ব্যতিক্রমী নীল ছোপ দেখা যেতেই সবার উৎসুক হয়ে নৌকা থামাল ,যা ভাবা হয়েছে তাই, সুবিশাল জল-কাদাময় ভূ-খন্ডের এক কোণায় কয়েকশ পদ্ম নীল কালেম পাখির ঝাক। মানুষের রসনা তৃপ্ত করতে করতে এদের অস্তিত্ব ধ্বংস প্রায়,বাংলার এইসব নির্জন বিরান প্রান্তরেই আজ তাদের আস্তানা।

সংগৃহীত : তারেক অনু | অনুভ্রমন

 

Leave a Reply