চন্দ্রালোকে চন্দ্রাহত

ভোর চারটা, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬- সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ের গোলাবাড়িতে নোঙর করা মাদারশিপ থেকে আমাদের ছোট্ট নৌকা খাল দিয়ে ঢুঁকে পড়েছে লেচুয়ামারা বিলে, পশ্চিম দিগন্তে বিশাল এক মরচেরঙা চাঁদ, তার ভুতুড়ে কম্পমান ছায়া পড়েছে হাওড়ের আঁধার জলে। তখন কাকচক্ষু জল এতই কালো যে মনে হচ্ছে আমরা যেন শূন্যে ভেসে পাড়ি দিচ্ছি কাঠের নৌকায়, আমাদের গন্তব্য বুঝি ঐ দূরের চাঁদ, যা আজ নেমে এসেছে হাওড়ের কাছাকাছি। দূরে যেখানে ঐ আপাত অদৃশ্য জলের শেষ, সেখানে আঁধারেরা জমে জমেই বুঝি বা মেঘালয়ের পাহাড়ের আবছা রূপ নিয়ে দাড়িয়ে আছে পরাবাস্তবতার দূত হয়ে।

বাতাসে বেশ হিম, তার চেয়েও ঠাণ্ডা হাওড়ের জল, তার মাঝেই নেমে পড়ি আমরা কজন, কোমর গভীরতায় নানা ধরনের ধারালো জলজ উদ্ভিদ এবং সেখানের বাসিন্দা লাখো লাখো জোঁকের তোয়াক্কা না করে বরং অশেষ আনন্দে ভাসিয়ে, কারণ আমরা মানেই তো অনেক জোঁকের খাদ্য জুটে গেল বেশ কিছু দিনের জন্য! কিন্তু সত্যি বলতে এখন গড়গড় করে লিখে চলেছি এইসব খুঁটিনাটি, কিন্তু তখন কেবল মাত্র খেয়াল করেছিলাম একটাই মাত্র জিনিস- বিশ্ব চরাচর ছাপিয়ে ওঠা, হাওড় প্লাবিত জোছনা।

ঠিক আগের ভরা পূর্ণিমায় টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ছিলাম আমরা, বেশ রাত হয়েছিল পৌঁছাতে, তাঁবু পাতার যাও বা ইচ্ছা ছিল, নৌকার ভাঙ্গা ছইয়ের ফাঁকফোকর দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়া রূপো রূপো জোছনা নিমিষের মধ্যে সেই ইচ্ছাকে দূর অস্ত করে ঘোষণা দিয়েই নিল যেন দস্তয়েভস্কির নিশিতে পাওয়া রূপালি রাতের নায়কের মত ‘যতই ঠাণ্ডা হোক, আমরা আজ এই ছইয়ের মধ্যেই থাকব’। থাকলাম, এবং ভিজলাম চন্দ্রকিরণে।

আবার পরের পূর্ণিমাতে যেন জোছনার আকর্ষণেই জীবনের সবচেয়ে জ্যোছনাময় সপ্তাহ কাটালাম হাওড়ে। মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিযায়ী হাঁসদের পায়ে রিং পরানো এবং তাদের লালা সহ কিছু উপাত্ত সংগ্রহ করে বার্ড ফ্লু গবেষণার কাজে ব্যবহার করা। এই ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতায় ছিল আই ইউ সি এন, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। সে এক ঘোর লাগা সময়, দিন রাত কাজ করে চলেছি সবাই বুনোহাঁস এবং অন্য পাখিদের নিয়ে, ভোরে যখন যাত্রা শুরু করি আকাশে এত্ত বড় এক চাঁদ থাকে, শীঘ্রই চাঁদ অন্য ভুবনে চলে যায়, কিন্তু পূর্ব দিকে রেখে যায় এক রক্ত লাল সূর্যকে। আবার সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে সূর্যদেব বিশ্রাম নেবার আগে আগেই রূপা চাঁদ উঁকি দিয়ে আকাশের বিপরীত প্রান্তে।

সন্ধ্যায় ডেরায় ফিরে চাঁদের আলোতে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে দূরে স্নানও সারা হয় জোছনা মেশানো রূপো জলে, কখনো বা সেই জাদুময় চাঁদকে আলিঙ্গনের মতলবে পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে যখন ঝরঝর করে জল ফিরে হাওড়েরই বুকে, রেখে যায় এক অলীক সজীবতা, জীবনটাকে বড্ড মায়াবী বলে বোধ হয়।

পাশেই হিজল আর করজের সারি, নিচে ঝরা পাতার স্তূপ। ভরা পূর্ণিমার আলোতে পাতা ছাড়া ডালগুলো যেন সব রূপকথার রাজ্যে সোনার পাতা- রূপোর ডাল- হীরের ফুলে পরিণত হয়। শনশন হাওয়া বইলে সেই আধাভৌতিক আলোছায়ায় আসলে ভয় নয়, রোমাঞ্চ অনুভূত হত ভীষণ ভাবে, বেঁচে থাকার রোমাঞ্চ! এই অপূর্ব ভুবনে জীবনকে ছুঁয়ে, ছেনে দেখার তীব্র আনন্দ।

মাঝে মাঝে মধ্যরাতে দুই নৌকা এক করে ভাসমান ষ্টেশন বানিয়ে পাখি রিং করার কাজ চলত, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী পরিণত হত চাঁদের নরম কিরণ প্লাবিত এক অচেনা ভুবনে। সেই রূপের মুগ্ধতায় আমরা যথাসম্ভব কাজ শেষ করে আবারও ফিরে ফিরে তাকাতাম রূপা চাঁদটার দিকে। আর চারপাশের জলজ জগত তখন পরিণত এক অলৌকিক বিশ্বে, যার আদি নেই, অন্ত নেই, আছে শুধু বর্তমান, আছে শুধু জোছনা, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধু মনের এক গহীন প্রকোষ্ঠে অসীম ভালোবাসায় জিইয়ে রাখা যায় কল্পলোকের স্বপ্ন রূপে।

আর সেই সারা সপ্তাহের জোছনার স্মৃতি নিয়ে আমরা কজন থেকে যায় চন্দ্রাহত হয়ে।

( চাঁদের তো আলো হয় না, হয় কিরণ। ঠিক তেমন চন্দ্রালোক মনে হয় চাঁদে গেলে তবেই বলে যায়, তবে কিনা সেই কয় দিন টাঙ্গুয়ার হাওড়ই পরিণত হয়েছিল এক অপূর্ব চন্দ্রালোকে, চাঁদের দেশে। তাই ভালোবেসে ‘চন্দ্রালোকে চন্দ্রাহত’ নামই রাখলাম।

জোছনা শিকারি বেশ কজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে আমরা, যারা সামান্য চাঁদের আলো দেখলেও উপর পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে

‘অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক,
জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই’)

সংগৃহীত : তারেক অনু | অনুভ্রমন

Leave a Reply