শতবর্ষ আগের ময়মনসিংহের পশু-পাখি

(F A Sachseর তত্ত্বাবধানে ১৯১৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ময়মনসিংহ গ্যাজেটর। সেখানের Fauna অংশটি এখানে দুর্বল বাংলায় দিলাম। এই অংশটি অনুবাদ করতে যেয়ে মূল সমস্যা হয়েছিল নাম নিয়ে, গত ১০০ বছরে প্রাণীদের বিশেষ করে পাখির জগতে নিত্যনতুন আবিষ্কারের ফলে, বিশেষত অধুনা ডি এন এ অ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে অনেকে পাখির গোত্র এবং পরিবারের ক্ষেত্রে আমরা ভুল ভেবেছিলাম, তাই ইংরেজি নাম তো বটেই, সঙ্গত কারণেই বৈজ্ঞানিক নাম পরিবর্তন করা হয়েছে অনেক পাখির। যাদের কোন কোনটার বর্তমান নাম যে কী তা এখন পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছি না। এবং অতি দুঃখজনক ভাবে এখানে বর্ণিত কিছু পশুপাখি বাংলা তো বটেই, সারা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, যেমন গোলাপিমাথা-হাঁস।)

রেনল্ড বলেছেন উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এখানের চরগুলোর উত্তর-পশ্চিমে ভারতবর্ষের যে কোন জেলার মতই বাঘের দেখা মিলত এবং মাঝে মাঝে গণ্ডার শিকারও চলত। মধুপুরের জঙ্গল এবং গারো পাহাড়ের পাদদেশে বাঘ এখনো অনেক আছে কিন্তু অনেক হাতি ছাড়া তাদের পাওয়া মুশকিল। সব থানাতেই চিতাবাঘ মাঝে মাঝেই শিকার করা হয়। কাঁঠালের মৌসুমে ভালুকেরা পাহাড় থেকে নেমে আসে এবং মধুপুরের স্থানীয় শিকারিদের শিকারে পরিণত হয়।

উত্তরের গ্রামগুলোতে বুনো হাতি একসময় ত্রাস তৈরি করতে কিন্তু এখন তারা ঘেরের মাঝেই সীমাবদ্ধ। ১৯১৫ সালে সুসং রাজ গারো পাহাড়ের ভিতরে খেদা দিয়ে হাতি ধরার চেষ্টা করে এবং দুই দিন ধরে সেই হাতিদের নিয়ে যাওয়া হয় এবং দুর্গাপুর বাজারের কেন্দ্রে তাদের ধরা হয় !!!

৩ বছর আগে একটি পাগলা হাতিকে থানা থেকে কয়েক মাইল দূরে গুলি করা হয়।

কলমাকান্দার উত্তরের ঘাস বনে এবং মধুপুর জঙ্গলের উত্তর-পশ্চিমে বুনো মহিষ কোন অজানা প্রাণী ছিল না।

শম্বর, বারশিঙা, প্যারা হরিণ এবং মায়া হরিণ এখনো দেখা যায়, তবে প্রথম দুটি বেশ বিরল এবং শেষের দুইটি সবখানেই দেখা যায়। গারোরা জাল দিয়ে শম্বর ধরে এবং অন্য হরিণগুলোকে তাদের পানি খাবার স্থানের কাছে লুকিয়ে থেকে শিকার করে। ময়মনসিংহ-সিলেটের সীমান্তের কাছে বাউসন নামের এক স্থানের বনে প্যারা হরিণ এত বেশি পরিমাণে আছে যে স্থানীয় শিকারি এবং মাহুতেরা একে হরিণবাগান বলে ডাকে।

মধুপুরের জঙ্গলে বানর সবখানেই দেখা যায়। গারো পাহাড়ের পাদদেশে উল্লুকের ডাক শোনা যায় বটে, কিন্তু তাদের দেখা পাওয়া কঠিন। 
বুনো শূকর বেশ বিরল, এবং পাহাড়ের পাদদেশে তাদের শিকার করা প্রায় অসম্ভব। ক্ষুদে প্রাণীদের মাঝে বেজি এবং খাটাসের দেখা যত্রতত্র মেলে। শেয়াল এবং খেকশেয়াল চরে দেখা যায়। আসামি খরগোশ/ Hispid hare (Caprolagus hispidus)মধুপুরের জঙ্গলে প্রচুর ছিল। ভোঁদড়েরা বেশ বিরল, যদিও ভালো মতে সন্ধান করলে তাদের দেখা মিলতেও পারে।

পাখি

শিকারের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পাখি হচ্ছে লাল-বনমুরগি, যাদের গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রতি সন্ধ্যায় দলে বেঁধে খেতে দেখা যায়, দলে সাধারণত ১০টির বেশি বনমুরগি থাকে। স্বভাবে লাজুক হলেও মধুপুর জঙ্গলের সিঙ্গারচলা, জুগিরকোপা, শালগ্রামপুর এবং অন্য জায়গায় এদের এন্তার দেখা মেলে। সারা জেলার নানা অঞ্চলে কোয়েলের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, বিশেষ করে রাজ-বটেরা (Blue-breasted Quail) এবং মেটে-তিতিরের (Grey Francolin) বড় দলকে ঘাসের বনে পাহাড়ের পাদদেশে সদ্য কাটা ধানের ক্ষেতে খেতে দেখা যায়। অন্য পাখিরা সাধারণত পাহাড়েই থাকে যেমন Francolinus Patridge, মথুরা আর বিরল বন-চ্যাগা/Wood Snipe(Gallinago nemoricola). বড় বগা দুর্গাপুর জলার স্থায়ী বাসিন্দা, পাতি-বনবাবিল এবং ছোট-কুবো সম্ভবত ময়মনসিংহের আর কোথাও মেলে না।

বুনোহাঁস শিকারের জন্য কালিয়াজুরি পরগণা অতিবিখ্যাত। নভেম্বর থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে উষ্ণতাময় দিনগুলোতে ল্যাঞ্জাহাঁস সহ নানা জাতের অগণিত হাঁস সেখান দেখা যেত, এবং ল্যাগুন আকৃতির বিলের জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত জঙ্গল শিকারিদের গা ঢাকা দিয়ে শিকার করার জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে গণ্য হত, বিশেষ করে যেখান বড় আকৃতির হাঁসের থাকত। মার্চের পর অবশ্য একমাত্র দেশি-মেটেহাঁসদের দেখা মিলত। তারা এবং বিরলতর গোলাপিমাথা-হাঁস এই জেলায় প্রজনন করে। এটি একটি অদ্ভুত ব্যাপার যে সরালি এবং বালিহাঁসের ক্ষেত্রে বুনো পাখি সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা হলেও এই দুই হাঁসের ব্যাপারে করা হয় নি।

যমুনার চরে নানা জাতের হাঁস থাকে, বিশেষ করে বিরল চকাচকি (Tadorna cornuta )কিন্তু তাদের কাছে যাওয়া অনেক কঠিন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই গরাদমাথা-রাজহাঁসেরা চলে আসে। কেবলমাত্র ফেব্রুয়ারির শেষে যখন তারা প্রিয় চারণক্ষেত্রে চরগুলো ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে তখনই কেবল স্থানীয় ছোট নৌকার সাহায্যে কাছে যেয়ে বন্ধুকের আওতায় আনা যায়।

Anser Ruburoslus রাজহাঁস কেবলমাত্র মৌসুমের শুরুতে এবং শেষে দেখা যায়, ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এরা এই অঞ্চলে কেবলমাত্র পান্থ-পরিযায়ী।

কোড়া পাখি গ্রামের মানুষদের কাছে লড়াইয়ের জন্য অতি প্রিয় এবং বিচিত্র পদ্ধতিতে তাদের প্রজনন করানো হয়। বুনো কোড়ার বাসা থেকে ডিম সংগ্রহ করে তুলা দিয়ে মুড়িয়ে নারকেলের খোলার মধ্যে ঢুকিয়ে একজন মানুষের (সাধারণত যে ডিম খুঁজে পায়) কোমরের সাথে বেঁধে রাখা হয়, সেই মানুষের দেহের তাপেই ডিম ফুটে কোড়ার বাচ্চা বের হয়। অনেকেই এইভাবে বাচ্চা ফুটায় এবং তাদের দাম হয় কমপক্ষে ১০ রূপী।

মেঘনায় নভেম্বরে গেওয়ালা-বাটান এবং Machetes Pugnari র বিশাল ঝাঁক চলে আসে, পুরুষেরা ইতিমধ্যেই তাদের প্রজননকালীন সজ্জা হারিয়ে ফেলে যেখান থেকে তাদের নাম এসেছ! তবে বড় আকৃতি দেখে তখনও তাদের চেনা যায়। পাখিগুলো বেশ সুস্বাদু।

বাঘা-বগলা(Botauras stellaris) মাঝে মধ্যে দেখা মেলে এবং পাতি-সারস (Grus cinerea) কেবল শীতের আগন্তক।

দাগি-ঘাসপাখি/ Striated grassbird ( Megalurus palustris) দের নলবনে গঙ্গাফড়িঙের টোপ দিয়ে ধরে শিকারিরা কোলকাতায় পাঠায়, সেখানের নিউমার্কেটে এদের বিকিকিনি চলে। মাছের পুকুরের আশে পাশে সবসময়ই শঙ্খচিলদের ঝাঁকের দেখা মেলে, মাঝে মাঝে মেছো-ঈগল এবং অসপ্রেদের দেখা যায়। কাছের নদীতে প্রায়ই দেশী গাঙচষা/ Indian skimmer (Rhynchops albacollis)এর ঝাক দেখা যায়। এছাড়া শীত ও বসন্তে একটি বড় আকৃতির গাঙচিলের Larus Brunneicephalus দেখা বড় নদীগুলোতে মেলে।

ভারতবর্ষে দেখা মেলে এমন ৮ ধরনের মানিকজোড়ের মধ্যে কেবল ধলা-মানিকজোড়, ম্যারাবু(!) এবং কালা-মানিকজোড় বাদে সবই যমুনার চরে দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে বড়-মদনটাক, রাঙ্গা-মানিকজোড় এবং ধলাগলা-মানিকজোড়। Jabim(Loharjung) এবং শামখোল সহ কাস্তেচরার দেখা নদী বাদেও ভিতরের বিলগুলোতে মেলে। পোড়াবাড়ি স্টিমার ষ্টেশনের কাছেও চামচঠুটিদের দেখা গেছে।

ছোট সৈকতপাখিদের মধ্যে পাকরা-উল্টোঠুটিদের দেখা মেলে। উপরের দিকে বাঁকা অদ্ভুত চঞ্চু এবং সাদা-কালো বর্ণের পাখিটিকে বিরল মনে করা হলেও চরের এক চিত্তাকর্ষক বাসিন্দা হিসেবে তাকে ধরা যায়। Stilt এর দেখা অনেক বেশি মেলে এবং খাদ্য হিসেবেও সে উৎকৃষ্ট। যমুনায় গুলিন্দা এবং নাটা-গুলিন্দার দেখা মেলা ভার। পাতি-সবুজপা/ Common Green-shank পানি জমে থাকা ছোট ছোট গর্তে থাকে কিন্তু এদের খুঁজে পাওয়াও মুস্কিল। Little Green-shank (Sotanus stagnatilis). পাতি-লালপা, মেটে-জিরিয়া মাঝে মাঝে দেখা যায়। হট-টিটি সব বড় নদীতেই দেখা যায়, আর আগস্টের বন্যা শুরু হবার পরপরই সোনাজিরিয়া চরে পড়া নতুন কাদার স্তর থেকে খাদ্য সংগ্রহ শুরু করে। এই সময়ে তারা খুব বেশি শান্ত থাকে, অনেকটা ইংল্যান্ডে বুনোহাঁসগুলোর মতো, এবং তখনই শিকারের মৌসুম শুরু হয়। অন্যান্য ছোট পাখিদের মধ্যে আছে ছোট-নথজিরিয়া, Sotanus glavola, পাতি-বাটান, সবুজ-বাটান, এবং আবাবিলের মত দেখতে বাবুবাটান ও ছোট-চাপাখি।

পাকরা-উল্টোঠুটির মত অন্যান্য বিরল পাখির মধ্যে আছে বড়-মোটহাটু যা কিনা যমুনায় অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে বেশি দেখা যায়, এর বড় আকৃতি, বিশেষ ধরনের চঞ্চু, যার সাথে জিরিয়ার চেয়ে কাকেরই মিল বেশি, এবং চশমার মত চোখ যার প্রথম দেখায় রাঙা-চ্যাগার চোখ মনে হয়, এতসব ব্যতিক্রমি বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাণীবিদদের এর সঠিক গোত্র ও ক্রম বাহির করতে যথেষ্টই বেগ পেতে হয়েছে।

নানা জাতের চ্যাগা সংখ্যায় অনেক হলেও এদের খুঁজে পাওয়া নেহাত সহজ নয়। আস্তাগ্রাম, ধলাপাড়া এবং মাদারগঞ্জ নানা সময়ে অনেক চ্যাগা শিকার করা হয়েছে। এদের মাঝে ছিল ল্যাঞ্জা-চ্যাগা, জ্যাক-চ্যাগা, Fantail Snipe। এছাড়া ভোঁতাভরত (short-toed lark), ortolans, বিশাল ঝাঁক বেধে এপ্রিল মাসে চষা জমিতে খাবার খেতে আসে। এই জেলার অন্যান্য পাখিগুলো সবচেয়ে ভালো পর্যবেক্ষণ করা যায় মধুপুর জঙ্গলে।

নিচের তথ্যগুলোর জন্য জনাব L.R.Fawcusএর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

বুলবুল- 
সবচেয়ে বেশি দেখা যায় Pycnonotus pyyaeus এবং সিপাহি-বুলবুল। আসামি-বুলবুল (Rubigula flaviventris) মার্চ এবং এপ্রিল মাসে অদ্ভুত কোন কারণে বেশ দেখা যায়। সাধারণত এরা জোড়া বেঁধে থাকে এবং আম বা অন্য বড় গাছে ফুল ধরা অবস্থায় পোকা শিকাররত অবস্থায় পাওয়া যায়। সোনাকপালি-হরবোলা (Phyllornis aurifrons) সবখানেই দেখা যায়। এটি অন্য বুলবুলদের তুলনায় বেশ লাজুক এবং বেশি সময় শূন্য থাকে। পাতি-ফটিকজলও জঙ্গলে বেশ দেখা মেলে।

বেনেবউ-
বেনেবউদের মাঝে আমি একমাত্র কালামাথা-বেনেবউও দেখেছি এখানের জঙ্গলে।

Leiotrichinae– 
একটা দারুণ আবিস্কার ছিল- উদয়ী-ধলাচোখ (Zosterops palpebrosus) জার্ডনের মতে বাংলার এই এলাকায় এটি থাকার কোন সম্ভাবনায় নেই। গহন অরণ্যে ফুলে ভরা একটি বিশাল গাছে যে পাখিদের দলট থেকে আমি এই পাখির নমুনা সংগ্রহ করি তা আরেকটি হিমালয়ের পাখিদের Red Honeysucker সাথে ছিল। তিতগুলো সেখানে পোকা শিকারে ব্যস্ত ছিল।

Parus cinereus – 
Indian Grey Tit জঙ্গলে থাকার কথা যেহেতু আমি শীতকালে দুইবার ময়মনসিংহের অন্য এলাকায় দেখেছি।

Timalinae –
এই পরিবারের দুটি বিরল পাখি মধুপুরের জঙ্গলে থাকে, একটি অ্যাবটের ছাতারে (Trichastoma Abbotti) যাদের একটি বিশেষ এলাকায় মার্চ মাসে ভালই দেখা যায়। ছোট দলে বেঁধে এরা উড়ে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করে, অনেকটা সাতভায়লার মত। তবে এরা অতটা হট্টগোলকারী পাখি নয়। Yellow-breasted Wren babbler (Mirornis rubicapilus) দের আম গাছের উপরের ডালে দল বেঁধে শিকার করতে দেখেছি। আর সাতভায়লার দেখা সর্বত্রই মেলে।

Sylviadae-
টুনটুনি এবং সবজে-ফুটকি(Phylloscopus viridanus) সহজেই দেখা যায়।

Corvidae-
পাতিকাক, দাড়কাক এবং হাড়িচাচা সবখানেই আছে। শালিকদের মাঝে ভাত-শালিক, ঝুঁটি-শালিক ও পাকরা-শালিক খুব বেশি দেখা গেলেও গাঙ-শালিক এবং খয়রালেজ- কাঠশালিক অপেক্ষাকৃত বিরল। এই সব প্রজাতির পাখিরা ৭ থেকে ৮ টি দল বেঁধে বিচরণ করে এবং অন্য শালিকের তুলনায় বাতাসে বেশি সময় কাটায়।

Laniadae –
লাটোরাদের মাঝে মেটেপিঠ-লাটোরা ও ল্যাঞ্জা-লাটোরা সবচেয়ে সংখ্যায় বেশি। পাতি-বনলাটোরার দর্শনও সহজেই মেলে। এছাড়া বড়-কাবাসি জঙ্গলের উম্মুক্ত এলাকার সরব বাসিন্দা। এরা সাধারণত জোড় বেঁধে থাকে এবং চিত্তাকর্ষক ভাবে ডাকতে থাকে।

Columbidae-
হলদেপা-হরিয়াল এবং কমলাবুক-হরিয়াল এই জঙ্গলে দেখা যায়, প্রজননকাল ছাড়া হলদেপা-হরিয়ালের বড় ঝাঁকের দেখা সহজেই মেলা। এপ্রিল মাসে এই পাখির বাসায় দুটি ডিম দেখেছিলাম, বাসাটি মাটি থেকে মাত্র ৫ ফুট উপরে ছিল। কমলাবুক-হরিয়াল অপেক্ষাকৃত বিরল এবং বড় দলে বিচরণ করে না, জঙ্গলের শুষ্ক অংশেও এদের দেখা মেলে না। এরা পানির আশেপাশে থাকতে পছন্দ করে। আমি নিজে কোন ধুমকল দেখি নাই কিন্তু কচ শিকারিরা এদের পোগোনেট বলে ডাকে, যে নাম চট্টগ্রাম এবং আসামে ব্যবহার করা হয়। শিকারিদের ভাষ্যমতে, আগে এই পাখিদের অনেক দেখা যেত কিন্তু বর্তমানে কেবল জঙ্গলের পূর্বে মল্লিকবাড়ি এলাকায় দেখা যায়। সম্ভবত তারা সবুজ-ধুমকলের কথাই বলছে।

পাতি-শ্যামাঘুঘু গহন বনের এক সুন্দর বাসিন্দা। শীতের শেষে যখন পানি কমে যায় সমগ্র অঞ্চলে তখন এই লাজুক পাখিদের কিছুটা দেখা মেলে, এক শুষ্ক মার্চের সন্ধ্যায় অন্তত এক ডজনকে বনের মাঝের ডোবায় জলপান করতে দেখেছিলাম। গোলাপায়রা আর সব জায়গার মত এখানেও দেখা যায়। অন্যান্য ঘুঘুদের মধ্যে আছে তিলা-ঘুঘু, লাল-রাজঘুঘু, উদয়ী-রাজঘুঘু এবং ইউরেশীয়-কণ্ঠীঘুঘু।

সাপ-
সৌভাগ্যজনক ভাবে কোবরা ময়মনসিংহে বেশ বিরল। বিষাক্ত সাপদের মাঝে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে শঙ্খিনী, যা তার চওড়া কালো এবং হলুদ বলয়ের মাধ্যমে সহজেই চেনা যায়। Kraitও সহজেই পাওয়া যায়, যদিও একে চেনা বেশ কঠিন, কারণে শরীরের বর্ণের কারণে এদের দেখতে একটি নির্বিষ সাপের মত লাগে। মেঘনায় একটি জলচর বিষাক্ত সাপ প্রায়ই জেলেদের জালে আটকা পড়ে, Hydroptus Nigrocunctus, যার লেজ একেবারেই পাতের মত সমতল। এর জলপাই-সবুজ দেহে ৫৬টি কালো বলয় থাকে। ময়মনসিং শহরে অজগর মারার রেকর্ড আছে। নানা ধরনের গিরগিটি এবং গুইসাপ শহরে এবং বনে দেখা যায়। কুমির মাঝমাঝে ব্রহ্মপুত্রে দেখা যায় তবে জিঞ্জিরাম এবং মেঘনার কিছু এলাকায় তাদের সহজেই দেখা মেলে।

অধিকাংশ বিল এবং নদী মাছে পরিপূর্ণ। বৃষ্টি শুরু হবার সাথে সাথে প্রতিটি ধানক্ষেত এবং ডোবায় মাছ ধরা শুরু হয়ে যায়। ভোজনরসিকদের কাছে প্রিয় মাছ হচ্ছে রুই, কাতলা, মৃগেল এবং বাউস, এছাড়া শিং, বোয়াল,মাগুর, চিতল, পাইশ্যা। ইলিশ অবশ্য আমদানি করতে হয় মেঘনা ও যমুনার দূরবর্তী অঞ্চল থেকে। সোমেশ্বরী এবং যমুনায় মাঝে মাঝে মহাশোল পাওয়া যায়, যা চড়া দামে স্থানীয়দের কাছে বিক্রি হয়। মাঝে মাঝে বেশ বড় আকারের চিংড়িও মেলে, যা বিশাল সংখ্যায় ময়মনসিংহে ট্রেনে করে আসে।

( দুষ্প্রাপ্য গ্যাজেটরটি জোগাড় করে দেবার জন্য লেখক-গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা চাই এভাবেই দেশের প্রতিটি জনপদের হারিয়ে যাওয়া কাহিনী উঠে আসুক নতুন প্রজন্মের কাছে। আপনি কি দায়িত্ব নেবেন যে অঞ্চলে আছেন অন্তত সেখানের গল্প শোনানোর? )

সংগৃহীত : তারেক অনু | অনুভ্রমন

Leave a Reply