বিগত ২০০ বছরে রাজশাহীর বন্যপ্রাণীর ইতিহাস

পদ্মার চরে ঘড়িয়াল দেখি নি আমরা কোনদিনই, আগে গেলেই শুশুকের দেখা মিলত, এখন কালেভদ্রে উঁকি দিয়ে আমাদের ধন্য করে পদ্মার এই ডলফিনেরা। বন্যপ্রাণী বলতে দেখেছি কেবল শিয়াল, বেজি, গুইসাপ, বাদুড়, সাপ আর পাখি। তাই ১৯১৬ সালে ছাপা L S S Omalley রচিত রাজশাহী গ্যাজেটর-এ রাজশাহী অঞ্চলের সেই আমলের নানা পশু-পাখির কথা পড়ে ভাবলাম অসাধারণ কিন্তু করুণ সেই ইতিহাস বাংলা করেই ফেলি, অন্তত জানিয়ে রাখি কী হারিয়েছি আমরা–

পুরো অঞ্চলটিই ছিল শিকারে ভরা এবং শিকারিদের জন্য স্বর্গ বিশেষ। ১৮৮৬ সালে ছাপা F B Simsonএর Sport in Eastern Bengal বইটিতে এর বেশ ভাল উল্লেখ আছে। জনাব সিমসন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য ছিলেন, ১৮৫০ সালে জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্র হিসেবে তিনি রাজশাহীতে যোগদান করেন। শেঈ আমলে পদ্মার চর ছিল ঘন জঙ্গলে ভর্তি, শুধু মাত্রা নীল চাষের জন্য ব্যবহৃত কিছু পরিষ্কার করা জায়গা ছাড়া নানা ঝোপঝাড়, নলখাগড়ায় ভরা ছিল বিস্তীর্ণ অঞ্চল, অনেক জায়গাতেই জঙ্গলে এইটাই দুর্ভেদ্য ছিল যে পালা হাতির পালের সাহায্য ছাড়া সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। চর ভর্তি থাকত বুনো মহিষে। সাধারণত এদের কাছে যেয়ে স্যাডল থেকে হর্স পিস্তল বা অন্য আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে শিকার করা হত। ১৮৬০-এর দিকে ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজার হ্যারি ডেভেরেল চর সোনাইকান্দিতে অত্র এলাকার শেষ বুনো মহিষটি শিকার করেন।

বরেন্দ্র ভূমি (বরিন) ছিল শিকারের জন্য আদর্শ, যেখানে বাঘের দেখাও মিলত। জনাব সিমসনের মত তাল, বাঁশ এবং অন্যান্য স্থানীয় গাছের সমন্বয়ে এইখানে ছিল বিশাল জঙ্গল, এবং জঙ্গলের তলদেশে থাকতে নানা ধরনের ঝোপ, যা ছিল নানা প্রাণীর লুকিয়ে থাকার জন্য যথার্থ জায়গা। তথাপিও বরিন অঞ্চল এতটাই অগম্য এবং গুলি করার জন্য ঝামেলাপূর্ণ ছিল অধিকাংশ শিকারি এই এলাকাকে সুনজরে দেখতেন না। ফলে শিকারের অধিকাংশ প্রাণীই এখানে নির্বিঘ্নে প্রজনন করত বছরের পর বছর। মাঝে মাঝেই হরিণ, বুনো শুয়োর বরিন সেখানে থেকে গ্রামে নেমে আসত, ঘাস এবং ঝোপে আশ্রয় নিয়ে তারা সবুজ ফসলের উপর হামলা চালাত। আবার পোষা হাতির পালের তাড়া খেলেই ফের বরিন এলাকায় পালিয়ে যেত। জলের উৎস এবং বরিন এলাকার মাঝেই চরে বেড়াত হরিণ (Hog-deer), যার পিছু নিত বাঘ এবং চিতাবাঘ।

কালা-তিতির(Black Francolin) এবং হরিণেরা ঘাসের জঙ্গলে আস্তানা গাড়ত। চিকোর নামের বাতাই(Patridge) জাতীয় পাখিটি ঝোপে, কাদাখোঁচা এবং সব জাতের বুনোহাঁসেরা জলের কাছেই থাকত। বরেন্দ্র অঞ্চলে যে একটিমাত্র শিকারের প্রাচুর্য ছিল তা হচ্ছে চিত্রা হরিণ(Spotted Deer)এবং ময়ূর, যা আমি বাংলার আর কোথাও শিকার করি নাই। এবং জীবনে এখানেই প্রথম আমি বাঘ দেখি। মহানন্দা তীরের অভয়া নামের এক পুরাতন নীল কারখানা ঘুরে দেখার পর জনাব সিমসন সেই পানিপূর্ণ উপত্যকায় ঘুরে দেখেন এবং তার রোজনামচায় শিকারের তালিকা লিপিবদ্ধ করেন- ৪টি হরিণ, ৯টি বাতাই, দুইজোড়া চাপাখি, ২টি বুনোহাঁস এবং একটি আহত বাঘ!

৫০ বছর আগে এই অঞ্চল বুনো মহিষ, বাঘ, চিতাবাঘ, বুনো শুয়োর, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণে ভরা ছিল। ক্ষুদে শিকারদের মধ্যে ছিল খরগোশ, ময়ূর, কালা-তিতির, বাদা-তিতির(Swamp Francolin), বৃষ্টি-বটেরা(Rain Quail), পাতি-ডাহর (Lesser Florican), নানা জাতের বুনোহাঁস, বনমুরগি, কাদাখোঁচার দল। এতসব প্রাণী মধ্যে কেবল চিতাবাঘ এবং বুনো শুয়োরেরাই টিকে আছে গ্রামের জঙ্গলগুলোতে, বাকিরা কৃষিকাজের জন্য জঙ্গলে কাটার জন্য হারিয়ে গেছে চিরতরে। পাখিদের মধ্যে অবশ্য অবস্থা কিছুটা ভাল, কেবল ময়ূর আর বাদা-তিতিরেরাই হারিয়ে গেছে। অল্প কয়েকটি কালা-তিতির আর পাতি-ডাহরের দেখা মেলে মাঝে মাঝে, আর বুনোহাঁস, বনমুরগি, কাদাখোঁচার দল আগের মতই আছে।

২০ বছর আগ পর্যন্তও বাঘেরা টিকে ছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবের জন্য গোদাগাড়ীর বরিন অঞ্চলের প্রতি বছর বিট করা হত, এবং ১৮৯৪ পর্যন্ত রাজশাহীর কালেক্টর এবং আরেকজন শিকারি রামপুর-বোয়ালিয়ার ৩ মাইলের মধ্যে বেশ কটি বাঘ মেরেছিলেন। শেষ বাঘটি দেখা গেছিল ১৯০০ সালে খরচাকাতে।

চিতাবাঘেরা এখনও আগের মতই প্রবল বিক্রমে সাহসিকতার সাথে টিকে আছে। রামপুর-বোয়ালিয়ার (রাজশাহী শহরের প্রাচীন নাম) কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রাচীরে ওঠার চেষ্টা করার সময় ১৯০৭ সালে একটিকে গুলি করা হয়, এছাড়া ১৯১৫ সালেও একটিকে শহরে দেখা গেছিল। একবার জানা যায় একটি চিতাবাঘ নরখাদকে পরিণত হয়েছে এবং রাজাপুর পুলিশ পোস্টের এলাকার ৪জন মানুষকে শিকার করেছে। অধিকাংশ চিতাবাঘই ছিল ছোট আকৃতির, যার বাসযোগ্য বনের অভাব এইখানে ছিল না। রামপুরবোয়ালিয়া থেকে মাইল দূরে অবস্থিত শিরইল গ্রামে এদের প্রায়ই ফাঁদ পেতে ধরা হত (ইহা তারেক অণুর মহল্লা) এবং সেখানে অনেক বনবেড়ালও দেখা যেত। অন্যান্য বুনো বেড়াল, শেয়াল এবং খরগোশ ছিল অগুনতি।

বুনো শুয়োরের বিচরণ ছিল সর্বত্র বিশেষ করে নদীর চরে। এক হিসেবে তারা আসলেই কোন কোন জনপদে হামলা করত এবং রাতের বেলা ধান ও আঁখ ক্ষেতের চরম ক্ষতিসাধন করত। মড়া-পচা খেকো বলে তাদের দুর্নাম ছিল এমনকি কাদায় আটকা পড়া গবাদিপশুদের ক্ষতি করার ঘটনাও শোনা গেছে।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সব শেষে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিন যা গঙ্গা এবং আত্রাই নদীতে, সেই সাথে চলন বিলের গভীর অঞ্চলেও সহজে দেখা যায়।

শীতকালে নদী এবং ভিতরের জলাঞ্চলে নানা জাতের পরিযায়ী পাখিরা আসত। চলন বিল, নওগাঁর ৬ মাইল দক্ষিনের দুবলহাটি বিল এবং মধুয়ানগর রেলষ্টেশনের কাছে অবস্থিত হালতি বিলে বুনোহাঁসের মেলা বসে। চা-পাখি, চ্যাগা এবং কাদাখোঁচারা বিলে এবং বাদা জুড়ে থাকে সারা জেলাতে। বড় চর এবং পদ্মার বালির চরে রাজহাঁসদের শিকার করা যায়, যেখানে মদনটাক (Adjutant Stork) এবং গগণবেড়(Pelican)দের দেখাও মিলে। অন্যান্য জলচর পাখিদের মধ্যে পানমুরগি, কুট, সারস, বক, জিরিয়া, বাটান ইত্যাদি নদী ও বিলে দেখা যায়। হরিয়ালও মেলে প্রচুর, এছাড়া কালা-তিতির, বাদা-তিতির, বৃষ্টি-বটেরা এবং পাতি-ডাহর এখনও টিকে আছে।

গেম-বার্ড বা শিকারের জন্য জনপ্রিয় পাখি বাদেও অন্যান্য নানা জাতের পাখি এই জেলায় অনেক কাছে কিন্তু জায়গার অভাব বিধায় যত্রতত্র দেখা যায় এমন কয়েকটি পাখির কথা উল্লেখ করছি। এখানের শকুনেরা পশ্চিমের শকুনের তুলনার বিশালকায় হয়, যারা গাছের উপরে বসে খাবারের অপেক্ষায় থাকে দিনমান, এদের ধৈর্যের অভাব নেই আবার এদের খাবার জন্য পচা-গলারও অভাব হয় না। বিল এবং নদীতে মেছো-ঈগলেরা রাজত্ব করে। কোকিল পরিবারের মধ্যে কানাকুয়ো (এটি মোটেও কোকিল নয়, তখন ভুল ভাবা হত) এবং দেশী-কোকিলের(Indian Koel) ডাকই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। রাতে সবসময়ই শোনা যায় রাতচরার (Nightjar) ডাক, বরফের মাঝে পাথর পড়ার মত শব্দ তুলে অবিরাম অস্তিত্ব জানান দেয় সে।

বিশাল সব নদী এবং বিলের কারণে এই জেলাতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। পদ্মা নদী থেকে পাওয়া মাছের দাম এক বছরে অন্তত দুই লাখ তো হবেই, সেই সাথে আছে আত্রাই থেকে পাওয়া মাছ! পদ্মার ইলিশ নামের অসাধারণ স্বাদের মাছটি ধরা পড়ে প্রচুর পরিমাণে। অন্যান্য মাছের মধ্যে রুই, কালবাউশ, কাতলা সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া মৃগেল, বোয়াল, মাগুর, আইড়, ট্যাংরা, বাছা ইত্যাদি মাছও বেশ সুস্বাদু এবং যথেষ্টই ধরা পড়ে। মাগুর এবং কই স্বাদু পানির মাছ যাদের সাধারণত একটু ময়লা পানিতেই দেখা মেলে, কই আবার কানকো ব্যবহার করে ডাঙ্গায় উঠতে পারে। দুবলাহাটির বিলের কই অতি বিখ্যাত, কিংবদন্তী বলে যে এই বিলের ইজারাদার মোঘল আমলে মোঘলদের কর হিসেবে বিশ হাজার কই মাছ দিত! মুক্তোওয়ালা ঝিনুক চলন বিল এবং পূর্বের নদীগুলোতে মেলে।

উত্তরবঙ্গের পাওয়া সকল সাপই রাজশাহীতে মেলে। সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া বিষাক্ত সাপগুলোর মাঝে আছে গোখরা, চন্দ্রবোড়া, কাল-কেউটে, শঙ্খিনী এবং রাজ-গোখরা। রাজ-গোখরা সাধারণত অন্য সাপ খেয়েই বাঁচে, যা ৭ থেকে ৮ ফিট পর্যন্ত লম্বা হয়।নির্বিষ সাপদের মাধ্যে বালুবোয়া, ঘরমৌনী, হেলে ইত্যাদি দেখা যায়, তবে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে জলঢোড়া সাপদের।

মূল নদী এবং কয়েকটি জলাধারে দুই ধরনের কুমিরের দেখা মেলে, একটি মাগার কুমির অন্যটি ঘড়িয়াল। মাগার কুমির ১২ ফুটের মত লম্বা হয়, যেখানে মাছখেকো সরু মুখের অধিকারী ঘড়িয়াল হয় ৮ ফিট। নদীর কচ্ছপ কালি কাইট্ট্যা প্রায় সবখানেই মেলে, এবং নিম্নবর্ণের মানুষেরা সেগুলো খেয়ে থাকে।

(এতটুকুই ছিল সেই আমলের গ্যাজেটে, চিন্তা করা যায় যে এই ১০০ বছরে উল্লেখিত প্রাণীগুলোর প্রায় ৯০% আমরা হারিয়ে ফেলেছি, বাকিরাও বিলুপ্তির পথে।দুষ্প্রাপ্য গ্যাজেটটির ফটোকপি ধার দিয়ে পড়বার সুযোগ করে দেবার জন্য প্রিয় গবেষক ব্যক্তিত্ব মাহবুব সিদ্দিকীকে অনেক অনেক ধন্যবাদ

এর আগে ঢাকার ৪০০ বছরের বুনোপ্রানীর ইতিহাস নিয়ে এই অসাধারণ লেখাটি অনুবাদ করেছিলাম, আমি চাই দেশের সব জেলা, সব অঞ্চল নিয়ে এমন তথ্যবহুল লেখা আসুক। কোন বাঙ্গালী সাধারণত এই কাজগুলো করে না বিধায় সেই আমলের কোন ইংরেজ প্রকৃতিবিদ বা শিকারির রচনার উপরেই আমরা নির্ভরশীল সেই অতীত আলোকপাতের জন্য। আপনি কি করবেন আপনার অঞ্চলের কাজটুকু??? )

সংগৃহীত : তারেক অনু | অনুভ্রমন

Leave a Reply